শনিবার বৃষ্টির কারণে খেলা হয়নি প্রায় আধা ঘন্টা। তাই গতকাল আধা ঘন্টা আগেই শুরু হয় খেলা। কিন্তু শনিবার রাত থেকেই সংশয় ছিল- খেলা হবে তো !
আবহাওয়া অধিদপ্তর আগেই জানিয়েছিল, ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু শেষদিনে গড়ানো টেস্টের শেষ মুহূর্তে এতো রোমাঞ্চ ও প্রাণের উপস্থিতি ছিল তা বুঝি শুধু বৃষ্টিই জানতো। হয়তো এ ভেবেই বৃষ্টি আর বিরক্ত করেনি! পণ্ড করেনি খেলা।
কাগজ-কলমে চট্টগ্রাম টেস্টটি অমিমাংসিত ঘরেই স্থান পেয়েছে। কিন্তু এই টেস্টের কিছু মুহূর্ত, কিছু অর্জন যে ক্রিকেট বিশ্বে নতুন ইতিহাসের জন্ম দিয়েছে! গোল বলের খেলা ক্রিকেট যে প্রতিটি বাঁকে বাঁকে জন্ম দিতে পারে অনিশ্চয়তা তা আবারও প্রমাণ হলো।
সকালটা শুরু হয়েছিলো একেবারেই নিরুত্তাপ রোদে। ঝলমল করছিলো ঠিকই, কিন্তু তাপ ছিলো না কোনোই। চট্টগ্রামের প্রকৃতিও যেনো টের পাচ্ছিলো জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের সাদামাটা টেস্টের সাধারণ পরিণতির কথা। এর প্রভাবে গত চারদিনের প্রাণবন্ত গ্যালারিও সকাল থেকেই ছিলো নীরবতার প্রতিনিধি হয়ে। সবার মনে নিষ্প্রাণ এক ড্র’র ছবি আঁকা হয়ে গিয়েছিলো দিনের শুরুতেই।
কিন্তু ক্রিকেট আগাগোড়াই উত্তেজনার খেলা। তবে সে উত্তেজনা কখনো দিনের আলোর মতো উজ্জ্বল, আবার কখনো তা বের করতে রীতিমতো গবেষণার প্রয়োজন হয়ে পড়ে! সাহারা কাপ টেস্ট সিরিজের প্রথম ম্যাচের শেষ দিনের শুরুতেও কিছু উত্তেজনা ছিলো। সে উত্তেজনার সমান্তরালে ছিলো অনেক অনেক ‘যদি-কিন্তু’ও।
শেষ দিনের উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত লুকিয়ে থাকেনি। অস্তিত্বের জানান দিয়ে ঠিক সময়েই প্রকাশ পেয়েছে ক্রিকেট-অনিশ্চিয়তার প্রত্যাশিত সৌন্দর্য। যা এক পর্যায়ে এতোটাই তুমুল আলোড়ন তুলেছিলো যে, প্রেসবক্সে বসা পেশাদারিত্বে মোড়ানো সাংবাদিকরাও দাঁড়িয়ে হাতের তালু ফাটিয়ে দিয়েছেন তালিতে তালিতে! কিছুক্ষণের জন্য হলেও জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের প্রেসবক্স মিশে গিয়েছিলো লাগুয়া গ্যালারির সঙ্গে!
উত্তেজনাহীন ক্রিকেটের শুরুটা হয়েছিলে নিউজিল্যান্ডের দ্বিতীয় ইনিংস থেকেই। ড্র’র জন্যই যেনো দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নেমেছিলো তারা। না হলে ৪০ ওভারের চতুর্থ দিনের খেলায় মাত্র ১১৭ রান কেনো উঠবে তাদের! ১৮৯ বলে ৫৯ রানের ছোট ইনিংসই বা কেনো খেলবেন!
ধীর ব্যাটিংয়ের নজির স্থাপন করে পঞ্চম দিন লাঞ্চ পর্যন্ত কিউদের সংগ্রহ ২১৮। এর মধ্যে আরো দুইটি উইকেট হারায় তারা। সেই সাথে চলতে থাকে প্রাণহীন ক্রিকেটের প্রদর্শনী।
তারপর লাঞ্চের পর আবার ব্যাটিংয়ে নামে নিউজিল্যান্ড। ততক্ষণে বিধাতাও হয়তো নিরুত্তাপ ক্রিকেটে কিছুটা ত্যাক্ত বিরক্ত হয়ে পড়েছেন, এবং বাধ্য হয়ে সোহাগ গাজীকে দিয়ে দিয়েছেন তাপ ছড়ানোর ‘ঐশি’ দায়িত্ব। বিধাতা ভুল করেন না, সোহাগ গাজীও তাই তাপ ছড়িয়ে দিলেন যতোটুকু সম্ভব। যাতে প্রায় শূন্য গ্যালারিতেও ভর করলো রাজ্যের উত্তাপ। চট্টগ্রাম থেকে যা মুহুর্তেই ছড়িয়ে গেলো ৫৬ হাজার বর্গমাইল ছাড়িয়ে বিশ্ব ক্রিকেট সম্রাজ্যের প্রতিটি অলিগলি পর্যন্ত!
লাঞ্চের আগেই দিনের প্রথম দুই উইকেট দখল করে রেখেছিলেন সোহাগ। পিটার ফুলটন ও উইলিয়ামসনকে সাজঘরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। লাঞ্চের পর ফিরিয়েছিলেন কিউই অধিনায়ক ম্যাককালামকে। তারপরই নিজের ২৪তম ওভারে উত্তাপ ছড়ানোর কাজটি করে দেন সোহাগ। যে কাজটি এতোটাই প্রতাপ ছড়ানো যে, গ্যারি সোবার্স, ইয়ান বোথাম, কপিল দেব এবং ইমরান খানরাও এখন সোহাগে হিংসা করতে পারেন!
ওভারে নিজের দ্বিতীয় বলে লেগবিফোরের ফাঁদে ফেলেন কোরে অ্যান্ডারসনকে। এরপরের বলে মুশফিকের সহযোগিতায় ফেরান ‘যন্ত্রণার’ ওয়াটলিংকে। তারপরের বলে সোহাগ ফেরান ব্র্যাসওয়েলকে, প্রাণান্তকর প্রচেষ্টায় ক্যাচ তালুবন্দি করেন সাকিব। সোহাগের এ কীর্তিতে একটু হলেও ভাগ দাবী করতে পারেন মুশফিক ও সাকিব!
হ্যাটট্রিকই সোহাগ গাজীকে সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডারদের টপকে দেয়নি, তার আগে যে তিনি করে রেখেছিলেন সেঞ্চুরিও! একই ম্যাচে সেঞ্চুরি ও হ্যাটট্রিকের দৃষ্টান্ত প্রথম স্থাপন করলেন সোহাগই। আর সোহাগের ওই কীর্তির জন্যই হঠাত করে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিলো আপাত দৃষ্টিতে নিষ্প্রাণ মনে হওয়া টেস্টটি।
শেষ পর্যন্ত জয়ের জন্য ২৫৬ রানের টার্গেট পুরো করতে পারেনি বাংলাদেশ। তার আগেই থেমে গেছে পঞ্চম দিনের ঘড়ির কাঁটা। সেই সঙ্গে থেমে গেছে ম্যাচের শেষ প্রাণস্পন্দনটুকুও!
এদিকে, এই ম্যাচে বাংলাদেশের অর্জনের তালিকায় অনেক কিছুই যুক্ত হয়েছে। প্রথম ইনিংসে ভীষণ চাপের মুখে দুর্দান্ত ব্যাটিং করে মমিনুল যেমন করেছেন ১৮১। তবে সব ছাপিয়ে এটি হয়ে উঠেছে সোহাগ গাজীর ম্যাচ। এই ম্যাচটি সোহাগ নিজে তো বটেই, মনে রাখবে টেস্ট ইতিহাসও। ১৩৬ বছরের টেস্ট ইতিহাসে একই খেলোয়াড়ের সেঞ্চুরি ও হ্যাটট্রিকের কৃতিত্ব যে এই প্রথম। এই বিশ্বরেকর্ড গড়ার পথে হ্যাটট্রিকসহ ছয়টি উইকেটও নিয়েছেন সোহাগ।
দুদল মিলিয়ে এই ম্যাচে ২৭টি ছক্কা মেরেছে। এক টেস্টে সবচেয়ে বেশি ছক্কার রেকর্ডও এটি।
সাহারা কাপ টেস্ট সিরিজের পরের ম্যাচটি হবে মিরপুরের, ২১ অক্টোবর থেকে। তার আগে পঞ্চম দিনের সংবাদ সম্মেলনে লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়ে রাখলেন দুই অধিনায়ক। বেন্ডন ম্যাককালাম জানিয়ে রাখলেন সামনের ম্যাচে বাংলাদেশকে পরাজিত করার ইচ্ছে। তার পরপরই মুশফিকও দিলেন স্পিন দিয়ে কিউইদের ঘায়েল করার ঘোষণা!
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
নিউ জিল্যান্ড: ৪৬৯ (উইলিয়ামসন ১১৪, ওয়াটলিং ১০৩, ফুলটন ৭৩, বোল্ট ৫২*; রাজ্জাক ৩/১৪৭) ও ২৮৭/৭ ডিক্লে. (ফুলটন ৫৯, রাদারফোর্ড ৩২, উইলিয়ামন ৭৪, টেইলর ৫৪*, ম্যাককালাম ২২, অ্যান্ডারসন ৮, ওয়াটলিং ০, ব্রেসওয়েল ০, সোধি ২২*; সোহাগ ৬/৭৭, নাসির ১/২০)
বাংলাদেশ: ৫০১ (মমিনুল ১৮১, সোহাগ ১০১*; ব্রেসওয়েল ৩/৯৬) ও ১৭৩/৩ (তামিম ৪৬, এনামুল ১৮, মার্শাল ৩১, মমিনুল ২২*, সাকিব ৫০*; মার্টিন ২/৬২, সোধি ১/৫৭)
ম্যান অব দ্য ম্যাচ: সোহাগ গাজী।

No comments:
Post a Comment